রফিক আহমদ খান, মালয়েশিয়া থেকে
প্রবাস জীবনের দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পার করে দিয়েছি মালয়েশিয়া-তে। এর মধ্যে কত ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা কেটে গেছে দেশের বাইরে। প্রবাসে আপনজন একেবারে নেই—তা নয়। বরং বন্ধু, স্বজন, পরিচিত মানুষের বড় একটি পরিমণ্ডল রয়েছে। তবুও ঈদ এলেই হৃদয়ের গভীরে এক ধরনের শূন্যতা নাড়া দিয়ে যায়।
রোজার শেষ দিক থেকেই এই অনুভূতি স্পষ্ট হতে থাকে। সবকিছু থাকার পরও যেন কিছু একটা নেই—সেটা হলো মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের দেশের মাটি। সেই মাটির গন্ধ, গ্রামের পথঘাট, গাছপালা—সবকিছু যেন হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।
শেষ রোজার ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ শেষ হতেই মালয়েশিয়ার মসজিদগুলোতে শুরু হয় ঈদের তাকবির। চারদিক থেকে ভেসে আসে সুরেলা কণ্ঠে—
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার…”
অদ্ভুত এক ছন্দে, এক সুরে মসজিদে মসজিদে তাকবির ধ্বনিত হয়। মনে হয় যেন সব কণ্ঠ এক হয়ে গেছে। বাস্তবে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মুসল্লিরাই তা সরাসরি পাঠ করেন। এই সুরেলা তাকবির হৃদয় ছুঁয়ে যায় গভীরভাবে।
ঈদের সকালটাও শুরু হয় তাকবির শুনতে শুনতেই। ঘুম থেকে উঠে গোসল, হালকা খাবার, নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা—সবকিছুতেই যেন তাকবিরের সুর সঙ্গী হয়ে থাকে। মসজিদে গিয়ে নামাজের আগ পর্যন্ত সেই তাকবির শুনতে শুনতেই সময় কাটে।
কিন্তু এই হৃদয়ছোঁয়া তাকবিরের মাঝেই হঠাৎ করে চোখের কোণ ভিজে ওঠে। অজান্তেই জমে ওঠে অশ্রু। প্রবাস জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এই অনুভূতি একটুও বদলায়নি। সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে গেলেও ঈদের তাকবির শুনে বুকের ভেতরের শূন্যতা ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।
দেশে শৈশবের ঈদ ছিল অন্যরকম। শেষ রোজার দিন চাঁদ দেখার জন্য দৌড়ঝাঁপ, পশ্চিম আকাশে তাকিয়ে থাকা, আর চাঁদ দেখা গেলে ছোটদের আনন্দধ্বনি—“চাঁদ উঠেছে!”—এই স্মৃতিগুলো আজও মনে ভাসে। এখন প্রবাসে সেই জায়গা নিয়েছে মসজিদের মাইকে ভেসে আসা তাকবির। এখানেই বুঝতে পারি, ঈদ এসে গেছে।
তবুও স্বীকার করতেই হয়, প্রবাসেও অনেক আপনজন, বন্ধু ও পরিচিত মানুষ রয়েছে। তাদের সঙ্গেই কিছুটা হলেও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা যায়। আর মনে জাগে একটাই আশা—“আগামী ঈদ দেশে করব, ইনশাআল্লাহ।”
সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক। আসুন, আবারও তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করি—
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”


