নিজ থানায় হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনায় আদালতের আদেশে ওসির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হবার পর ৩৪ দিন ধরে ‘ছুটিতে’ আছেন পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিন ও একই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল আজিজ। হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত ব্যাখ্যাও জমা দেননি ওসি।
মামলার আসামি হওয়ার লম্বা এই ছুটি নিয়ে খোদ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলায় গ্রেফতার এড়াতে তিনি এ পন্থা অবলম্বন করছেন।
অন্যদিকে ফৌজদারি মামলার আসামি হলেও তাদের এখনো সাময়িক বরখাস্ত করেনি পুলিশ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সামনে ডায়ালাইসিস ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে আন্দোলন থেকে গ্রেফতার হওয়া সৈয়দ মো. মোস্তাকিমকে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে নগরের পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন (৪২) এবং একই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল আজিজের (৩৮) বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হলেও এর একদিন আগে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অসুস্থতাজনিত’ কারণে এখনও পর্যন্ত ছুটিতে রয়েছে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা।
এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ ড. বেগম জেবুননেছার আদালতে মামলার আবেদন করেছিলেন সৈয়দ মো. মোস্তাকিম। আদালতের নির্দেশে থানায় মামলা করেন চট্টগ্রাম সিআইডির পুলিশ সুপার শাহনেওয়াজ খালেদ।
আদালতে দায়ের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, সৈয়দ মোস্তাকিম তার মাকে গত ৭ বছর ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস করান। সম্প্রতি ডায়ালাইসিসের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তিনিসহ রোগীর স্বজনরা মিলে আন্দোলন করেন। গত ১০ জানুয়ারি তারা চমেক হাসপাতালের প্রধান গেটে জড়ো হয়ে মানববন্ধন করেন। পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সেখানে এসে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হন। এক পর্যায়ে ওসি নাজিম মোস্তাকিমকে গ্রেফতার করে প্রথমে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিচে মারধর করেন। পরে থানায় তাকে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। মারধরের সময় এসআই আবদুল আজিজ মোস্তাকিমকে বলেন ‘ওসি নাজিম স্যারের সঙ্গে আর বেয়াদবি করবি?’ এ সময় ওসি নাজিম বলেন, ‘শালারে রিমান্ডে এনে থানায় পিটাতে হবে, তারপর বুঝবি পুলিশ কি জিনিস?’ এরপর থানায় মারধরের বিষয়টি ফাঁস করলে মোস্তাকিমকে ক্রসফায়ার দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। গত ১০ ডিসেম্বর কিডনি ডায়ালাইসিস ফি বাড়ার প্রতিবাদে রোগীর স্বজনরা আন্দোলন করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরতদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। গ্রেফতার মোস্তাকিমের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৫০ থেকে ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, আসামি দুই পুলিশ কর্মকর্তা চার দিনের ছুটিতে গিয়ে আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি। আদালত আসামিদের শোকজ করেছেন, কিন্তু তারা জবাবও দেননি। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ অতি উৎসাহী হয়ে নিজেই জবাব দিয়েছেন। এটা তার কাছে চাওয়া হয়নি। ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি যা অপ্রত্যাশিত।
বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন, পাঁচলাইশ থানার ওসিসহ দুজনকে শোকজ করা হয়েছিল। তিনি অসুস্থতার কথা বলে দীর্ঘ ছুটিতে যাওয়ায় ওসি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোখলেসুর রহমান বলেন, পাঁচলাইশ থানার ওসি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এবং একই থানার এসআই আবদুল আজিজ অসুস্থতাজনিত কারণে গত ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ছুটিতে রয়েছে। তারা এখনও ছুটিতে রয়েছেন। তবে কেন তাদের সাময়িক বহিষ্কার করা হয়নি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।


