ফাতিমা ফাল্গুৃনী, প্রিয় চট্টগ্রাম: গ্রীষ্ম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দেশজুড়ে অনুভূত হচ্ছে অস্বাভাবিক তাপদাহ। সাধারণত চৈত্রের শেষভাগ থেকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে গরম তীব্র আকার ধারণ করলেও এ বছর আগেভাগেই প্রকৃতি যেন তার রুক্ষ রূপ দেখাতে শুরু করেছে। ফলে মৌসুমের শুরুর আগেই নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। প্রচলিত গরমের তুলনায় এবারের তাপমাত্রা যেন এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করছে—গা ঘামছে তুলনামূলক কম, কিন্তু ত্বকে লাগছে তীব্র জ্বালাপোড়ার অনুভূতি। এতে করে শহরাঞ্চলে বসবাসকারীরা পড়েছেন বাড়তি ভোগান্তিতে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই অস্বাভাবিকতার পেছনে প্রধান কারণ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ঋতুচক্রের পরিবর্তন মিলিয়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা ভেঙে পড়ছে। ফলে গ্রীষ্মের আগমনের সময় ও প্রকৃতি—দুটোই বদলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সূর্যের তাপ পৃথিবীতে আটকে থাকছে বেশি সময়, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে তাপমাত্রার ওপর।
নগর জীবনে এই গরমের প্রভাব আরও তীব্র। ইট, পাথর ও সিমেন্টে ঘেরা শহরে তাপ শোষণ ও বিকিরণের মাত্রা বেশি হওয়ায় ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব তৈরি হচ্ছে। এতে দিনের তাপ রাতেও পুরোপুরি কমে না, বরং ঘরের ভেতর জমে থাকে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও শুধু পাখার বাতাসে এই তাপদাহ মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও তা আবার বিদ্যুৎ চাহিদা ও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
ঋতুচক্রের এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য। একসময় যে বসন্ত ছিল ফুল, পলাশ-শিমুল আর মৃদু বাতাসের প্রতীক, তা এখন অনেকটাই সংক্ষিপ্ত ও অনুজ্জ্বল। একইভাবে শরৎ, হেমন্ত, শীত এমনকি বর্ষাও তার স্বাভাবিক ছন্দ হারাচ্ছে। কখনো অতি বৃষ্টি, কখনো খরা—এই চরম বৈপরীত্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে জলবায়ু সংকটের গভীরতার।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ ধরনের গরমে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, এমনকি গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্রমজীবী মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। প্রতিদিন অন্তত ৮ু১০ গ্লাস পানি পান করা, বাইরে বের হলে ছাতা বা মাথা ঢাকার ব্যবস্থা রাখা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলা জরুরি। পাশাপাশি লেবুর শরবত, ডাবের পানি বা ওআরএস স্যালাইন পান করলে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু সাময়িক কোনো আবহাওয়াগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সংকটের অংশ। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক উদ্যোগ। শহরে সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া ভবিষ্যতে এই তাপদাহ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, আগেভাগে শুরু হওয়া এই তাপদাহ যেন এক সতর্কবার্তা—প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামী দিনে এর প্রভাব আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গ্রীষ্ম আসার আগেই প্রচণ্ড গরম
সংবাদটি শেয়ার করুন
একটি মন্তব্য করুন
একটি মন্তব্য করুন


