চট্টগ্রামের হালদা নদী ও ঝিনাইদহের মারজাত বাঁওড়কে ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ৩৩ কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং জলজ পরিবেশ রক্ষায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রকল্পটির আওতায় জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এ দুটি এলাকাকে ইউনেস্কোর স্বীকৃত জীবমণ্ডল সংরক্ষণ নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। হালদা নদী বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক কার্পজাতীয় মাছের জিন ব্যাংক, আর মারজাত বাঁওড় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁওড়। প্রকল্পের কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হলে এ দুটি এলাকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ইউনেস্কোর কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ।
ইউনেস্কো তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালে ইউনেস্কো স্বীকৃত কোনো বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ নেই। তাই এসব দেশে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ প্রতিষ্ঠা ইউনেস্কোর অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশে সুন্দরবনকে সম্ভাব্য বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনেস্কোর এ উদ্যোগ দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি সংরক্ষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এদের পরিচিতি বাড়াবে। তবে তারা মনে করেন, কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তির আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব বা সংঘাত সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ (এমএবি) ইউনেস্কোর একটি বৈশ্বিক কর্মসূচি, যা ১৯৭১ সালে চালু করা হয়। এ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার টেকসই ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। নতুন এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার হালদা নদী এবং ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মারজাত বাঁওড়কে ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়কে ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে ইউনেস্কো। তাদের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এ দুই এলাকাকে সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য কোনো এলাকায় বিশেষ জীববৈচিত্র্য ও স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্রের উপস্থিতি, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান, জোনিং বা অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, গবেষণা ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন থাকতে হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ ঐতিহ্য এলাকায় প্রতিবেশভিত্তিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন প্রকল্প’-এর (ইবিএম-ইসিএ প্রকল্প) আওতায় ‘হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড় সংরক্ষণে বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (ইবিএম)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। জুন ২০২৪ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৫৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। প্রকল্পে অর্থায়ন করছে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) এবং উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কারিগরি সহায়তা দেবে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। বাংলাদেশে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়কে বিশেষ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের হালদা নদী এলাকায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষিজ প্রবাহ ব্যবস্থাপনার জন্য চারকোল ফিল্টার স্থাপন, প্রায় ২০০ পরিবারের জন্য স্যানিটারি পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থার সুবিধা নিশ্চিত করা, ১০০ হেক্টর জমিতে ৫০০ কৃষকের জন্য উন্নত সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ৮০০ মৎস্যজীবীর জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক অনুদান প্রদান। এছাড়া নদীর পানির গুণমান পর্যবেক্ষণে তিনটি অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন এবং কমিউনিটিভিত্তিক টহল কার্যক্রম চালু করা হবে। প্রকল্প এলাকার পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতায় একটি সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।
অন্যদিকে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জে অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মারজাত বাঁওড়কে ১৯৯৯ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রকল্পের আওতায় বাঁওড়ের ১০ হেক্টর এলাকায় পলি ও কাদা অপসারণে পুনঃখনন, জলজ কচুরিপানা ও আগাছা অপসারণ, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে কচুরিপানা থেকে প্যাকেজিং উপকরণ তৈরির প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে পাটের আঁশ ছাড়ানোর পাইলট উদ্যোগ গ্রহণ এবং নদীতীর ও নিম্নাঞ্চলের মাটি ও উদ্ভিদের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া ৫০০ মৎস্যজীবীর জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও আয় বৃদ্ধিতে অনুদান প্রদান, পানির গুণমান পর্যবেক্ষণে তিনটি অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন এবং কমিউনিটিভিত্তিক টহল কার্যক্রম চালু করা হবে। প্রকল্পের কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়কে ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য সরকার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেবে।
হালদা নদী বিশ্বের অন্যতম জোয়ার-ভাটাবিধৌত নদী, যেখানে কার্প প্রজাতির প্রাকৃতিক ও বিশুদ্ধ জিন ব্যাংক রয়েছে। প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে হালদা নদীতে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশের মতো কার্পজাতীয় মা মাছ প্রচুর পরিমাণে ডিম ছাড়ে। দেশের পুকুরে কার্পজাতীয় মাছের ৬০-৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে এ নদী। অন্যদিকে বাংলাদেশে যে ১৩টি পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রয়েছে, তার মধ্যে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার বারোবাজার এলাকার মারজাত বাঁওড় অন্যতম। আয়তনে এ বাঁওড়টি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম। এটি একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির বাঁওড়, যার আয়তন প্রায় সাত মাইল (১০ কিলোমিটার) লম্বা ও আধা মাইল চওড়া। এ বাঁওড়কে কেন্দ্র করে বহু জেলে পরিবারের জীবিকা গড়ে উঠেছে। বাঁওড়ে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, কমন কার্প, গ্রাস কার্প, মিরর কার্প, বিগহেড কার্প জাতীয় মাছ সরকারি ব্যবস্থাপনায় চাষ করা হয় এবং বছরে অন্তত দুইবার সরকারিভাবে মাছ ধরা হয়। এ বাঁওড়ে শীতে আগমন ঘটে বিপুলসংখ্যক পরিযায়ী পাখির। একই সঙ্গে বছরজুড়ে থাকে নানা প্রজাতির জলচর পাখির মেলা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ জোরদার করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকাকে সহায়তা করতে একটি বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো বাস্তবায়ন করা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে জলাভূমির জীববৈচিত্র্য, কৃষিজীববৈচিত্র্য এবং কৃষি ও মৎস্যসহ সংশ্লিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত আহরণ, দূষণ, আগ্রাসী বিদেশী প্রজাতির বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট হুমকি থেকে সুরক্ষায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কার্যকর করা হবে।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বণিক বার্তাকে জানান, ইউনেস্কো হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়ের জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করতে আগ্রহী। তাদের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর ৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচিতে যুক্ত করতে হলে এ দুই এলাকাকে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হবে। হালদা নদী রক্ষণাবেক্ষণ, দূষণ প্রতিরোধ, সার্বক্ষণিক মনিটরিং করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে। হালদা নদীকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণার বিষয়টি আগে থেকেই ছিল। এখন সেটি হচ্ছে না। যে কারণে ইউনেস্কো হালদাকে ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ মানচিত্রে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। হালদা ছাড়াও ঝিনাইদহের মারজাত বাঁওড়ও আছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দুটি এলাকাই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। ইউনেস্কো এখন এ কর্মসূচির জন্য পরিবেশবিদ, গবেষক এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ে কথা বলছে। প্রকল্পটির কাজও চলমান আছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়কে ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে এসব জলাধারসংলগ্ন এলাকার স্থানীয় জনগণকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্যে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, অতিরিক্ত মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ, জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ ও লাভের নিশ্চয়তা, পরিযায়ী পাখি শিকার বন্ধ, মৎস্যসম্পদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলাকাগুলোকে পুরোপুরি সংরক্ষিত অঞ্চলে রূপান্তর করা সম্ভব না হলেও একটি কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা প্রয়োজন। এ প্রকল্পের কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়কে ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির পথ সুগম হবে।
বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হালদা নদীকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ করার দাবি জানিয়ে আসছি দীর্ঘদিন ধরেই। এটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করতে হলে ইউনেস্কোর যে কয়টি শর্ত মানতে হয়, হালদার ক্ষেত্রে সেখানে বাধা নেই। কিন্তু ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করা হলে সেটার সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব তৈরির সম্ভাবনা বেশি। সে কারণে ইউনেস্কো হালদা নদীকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের আরেকটি কর্মসূচি ‘ম্যান অ্যান্ড বায়োস্ফিয়ার’ ঘোষণার বিষয়ে আগ্রহী। ইউনেস্কো বিষয়টি নিয়ে ওয়ার্কশপে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে, পরামর্শ নিয়েছে। হালদাকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নদীটি বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের অংশ হয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃতি লাভ করবে।’
অন্যদিকে মারজাত বাঁওড়ের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউনেস্কো চট্টগ্রামের হালদা ও ঝিনাইদহের মারজাত বাঁওড়কে ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচিতে যুক্ত করতে চায়। এখনো তারা এ বিষয় নিয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রস্তাব দেয়নি। ইউনেস্কো বিভিন্ন ওয়ার্কশপে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তাদের কর্মসূচির বিষয়ে আমাদের মতামত নিয়েছে। এ কর্মসূচিতে যুক্ত করতে হলে আগে বাঁওড়ের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে। মানুষের সঙ্গে সংযোগসহ তাদের সমস্যাগুলোও চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেন, হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড়—দুটিই জীববৈচিত্র্যের জন্য প্রসিদ্ধ। প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননে এ দুই জলাধার বড় ভূমিকা রেখেছে। এ দুই প্রকল্প এলাকা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিযায়ী পাখি ও কার্পজাতীয় মাছের সুরক্ষা এবং এ অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হালদার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে। নদীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হেরিটেজ ঘোষণা করা হলে নদীতীরবর্তী সব স্থাপনা অপসারণ করতে হবে। কিন্তু হালদার বর্তমান অবস্থায় সেটি সম্ভব নয়। সে জন্য ইউনেস্কো এ নদীর বর্তমান অবস্থান ঠিক রেখে একটি মানচিত্র তৈরি করবে। এ ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে হালদা নদীর বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। তাছাড়া নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, ভাসমান ল্যাব তৈরি করে নিয়মিত পানির মানমাত্রা পর্যবেক্ষণ, নদীর স্টেকহোল্ডারদের এক জায়গায় নিয়ে আসা, নদী দূষণ প্রতিরোধে কাজ করাসহ বিভিন্ন কাজ করা হবে প্রকল্পটিতে। তবে হালদার জন্য কাজটি কঠিন হলেও মারজাত বাঁওড়ের জন্য সহজ হবে। সে কারণে প্রকল্প শেষ হলে সরকার হালদা নদী ও মারজাত বাঁওড় সংরক্ষণে ইউনেস্কো ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ মানচিত্রে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে জলাভূমি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। এ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ নগরায়ণ, কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন। পাশাপাশি, কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, কৃষিজ রাসায়নিক, অব্যবস্থাপিত বর্জ্য ও যান্ত্রিক কার্যক্রম সরাসরি জলজ ও স্থল পরিবেশের দূষণ। অতিরিক্ত মাছ ধরা, অবাধ শিকার এবং কচুরিপানার মতো আগাছার অতিরিক্ত সংগ্রহ জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট করছে। সংবেদনশীল এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে আবর্জনা বেড়ে প্রাকৃতিক আবাসস্থলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয় মাছের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় বিদেশী প্রজাতির মাছ চাষ বাড়ছে, যা ইকোসিস্টেমে প্রতিযোগিতা তৈরি করে দেশীয় প্রজাতিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীবনচক্রে পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার প্রকোপ জলাভূমির জীববৈচিত্র্যকে আরো সংকটাপন্ন করে তুলছে। সব মিলিয়ে এ সংকট মোকাবেলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অংশ হিসেবে হালদা ও মারজাত বাঁওড়কে সংরক্ষণ করা জরুরি।


