সাইয়্যিদ মঞ্জু
১
দেশের উপকূলীয় মানুষের কাছে ২৯ শে এপ্রিল এক বিভীষিকাময় মহাপ্রলয়ের নাম। ঘূর্ণিঝড় ‘ম্যারিয়ান’ ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস কেড়ে নিয়েছিল উপকূলের প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষের প্রাণ। অনেক পরিবার আজও তাদের নিখোঁজ স্বজনদের কবরের চিহ্নটুকু খুঁজে পায়নি।
তিন দশকেরও বেশি সময় পার হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—আমরা কি সেই ভয়াল স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিয়েছি? আমাদের উপকূল কি আজ সত্যিই সুরক্ষিত?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অরক্ষিত উপকূলীয় বাঁধ আর নির্বিচারে প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) নিধনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মাঝে এই অবহেলা আমাদের এক বড় ধরণের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২
২৯শে এপ্রিলের সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২২৫ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী এবং ভোলা জেলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রচণ্ড বাতাস আর ঘূর্ণিঝড়ের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে উপকূলের মানুষ। গবাদি পশু আর মানুষের লাশ খাল বিলে সেই ক্ষত আজও উপকূলের মানুষ হিসেবে আমি নিজে ভুলতে পারিনি।
এই দুর্যোগ আমাদের শিখিয়েছিল ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের গুরুত্ব, আগাম সতর্কবার্তা প্রসারের প্রয়োজনীয়তা এবং উপকূলীয় বনায়নের অপরিহার্যতা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমরা সেই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচগুলোকে অবহেলা করতে শুরু করেছি।
সেই রাতে ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সকালটি ছিল বাংলাদেশের উপকূলের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সকাল। গাছের ডালে, ঘরের চালে এমনকি পুকুরের পানিতে ভেসে ছিল শত শত মানুষের লাশ। অনেক মা তার কোলের সন্তানকে আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃতদেহ দাফন করার মতো শুকনো মাটি বা জানাজা দেওয়ার মতো মানুষও অবশিষ্ট ছিল না অনেক গ্রামে। লোনা পানিতে সব পুকুর ও নলকূপ ডুবে যাওয়ায় উপকূলজুড়ে দেখা দিয়েছিল তীব্র সুপেয় পানির অভাব। কেবল মানুষ নয়, উপকূলের মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন কয়েক লক্ষ গবাদিপশু সেই জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, পেকুয়া,আনোয়ারা, সন্ধীপ উপকূলের ধানি জমিগুলো লোনা বালুর স্তরে ঢাকা পড়ে , চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে যায় ।
৩
উপকূলীয় মানুষের জন্য বেড়িবাঁধ কেবল মাটির বাঁধ নয়, এটি জীবনের রক্ষাকবচ। কিন্তু দেশের বিশাল উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিম্নমানের কাজ আর দুর্নীতির কারণে সামান্য জোয়ারের চাপেই বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হয়। যা আমরা মাতার বাড়ির মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতি বর্ষায় দেখি, তার পাশের দ্বীপ কুতুবদিয়ায় দেখি একই চিত্র।
বাঁধ ভাঙার ফলে জমিতে লোনা পানি ঢুকে পড়ছে এতে কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
উপকূল রক্ষায় প্যারাবনের ভূমিকা অনস্বীকার্য, এই ম্যানগ্রোভ বনগুলো ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমিয়ে দেয় এবং জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত মুনাফার লোভে এই বন ধ্বংস করা হচ্ছে।কক্সবাজারসহ উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় প্যারাবন কেটে তৈরি করা হচ্ছে চিংড়ি ঘের। একসময়কার নিবিড় বন এখন বিরান ভূমি। পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ বা শিল্পায়নের নামে অনেক জায়গায় সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। প্যারাবন কেবল আমাদের রক্ষা করে না, এটি মৎস্য সম্পদ এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। বন ধ্বংসের ফলে উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ছে। প্যারাবন নিধন মানে হলো প্রকৃতির দেওয়া ঢালকে নিজ হাতে ভেঙে ফেলা। আমরা যখন বনের গাছগুলো কেটে ফেলি, তখন জলোচ্ছ্বাসের সামনে আমাদের উপকূলীয় গ্রামগুলোকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ ও অরক্ষিত করে ফেলি।
৪
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মানচিত্রে প্রথম সারিতে রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের পানি এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের উপকূলের বড় একটি অংশ তলিয়ে যেতে পারে। আগে যেখানে ৫-১০ বছর পর পর বড় ঘূর্ণিঝড় হতো, এখন প্রতি বছরই ছোট-বড় ঝড়ের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রকৃতির খেয়ালিপনা বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও এখন অস্বাভাবিক জোয়ারে বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে। এই লোনা পানির কারণে উপকূলীয় মানুষ তাদের পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমায়।
তাই কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি এবং জলবায়ু তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যথাযথ প্রস্তুতি আর বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপই পারে আগামীর উপকূলকে নিরাপদ রাখতে।
৫
২৯শে এপ্রিলের সেই ট্র্যাজেডি ও সিড়র, আইলা,মোখার মতো ঘূর্ণিঝড় থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কেবল ত্রান বিতরণে সীমাবদ্ধ না থেকে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে আমাদের উপকূলীয় বাঁধগুলোকে আরও মজবুত ও উঁচু করা প্রয়োজন। বাঁধের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
যেখানে বন উজাড় হয়েছে, সেখানে পুনরায় বনায়ন করে প্যারাবন রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ করে স্থানীয় জনগণকে এই বন রক্ষায় সম্পৃক্ত করতে হবে। ‘সবুজ বেষ্টনী’ প্রকল্পকে কাগজ-কলম থেকে বাস্তবে রূপান্তর করা খুব প্রয়োজন। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো এবং সেগুলোকে নারী, শিশু ও গবাদি পশুর জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলা। উপকূলীয় কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান ও সবজি চাষের প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা সময়ের দাবি।
৬
২৯শে এপ্রিল আমাদের জন্য কেবল শোকের দিন নয়, এটি আমাদের সতর্কবার্তা দেওয়ার দিনও। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে আমরা যদি আমাদের প্যারাবন রক্ষা না করি এবং উপকূলীয় বাঁধগুলোকে মজবুত না করি, তবে আগামী দিনের ঘূর্ণিঝড়গুলো ১৯৯১ সালের চেয়েও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
উপকূলের মানুষ কেবল ত্রাণ চায় না, তারা চায় বাঁচার মতো নিরাপত্তা। প্রাকৃতিক বন আর মজবুত বাঁধই পারে সেই নিরাপত্তা দিতে। আমরা প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে জিততে পারব না, বরং প্রকৃতিকে সাথে নিয়েই আমাদের টিকে থাকতে হবে। প্যারাবন বাঁচলে উপকূল বাঁচবে, আর উপকূল বাঁচলে তবেই সুরক্ষিত থাকবে বাংলাদেশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ভূখণ্ড রেখে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। ২৯শে এপ্রিলের স্মৃতি যেন কেবল কান্নায় হারিয়ে না যায়, বরং তা যেন হয় আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা।
২৯শে এপ্রিল আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষ কতটা অসহায়। কিন্তু সেই অসহায়ত্বকে জয় করার প্রধান অস্ত্র ছিল আমাদের উপকূলীয় বনভূমি। আজ যখন চিংড়ি ঘের বা বিলাসবহুল রিসোর্টের নামে আমরা কুঠার দিয়ে সেই প্যারাবন কাটছি, তখন আসলে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি ‘মৃত্যুফাঁদ’ তৈরি করছি। ১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিল সেই ২ লক্ষাধিক (সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে ভিন্নতা রয়েছে) বিদেহী আত্মার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব তখনই, যখন আমরা আমাদের উপকূলকে সবুজের চাদরে ঢেকে দেব এবং প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের গ্যারান্টি দিতে পারব। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়, প্রকৃতিকে লালন করেই আমাদের টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
লেখক: কবি ও সম্পাদক।


