মির্জা ইমতিয়াজ শাওন: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস দেখানো সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল যেখানেই থাকুক না কেন, তা চিহ্নিত করে নির্মূল করা হবে।
রোববার (৩১ মে) সকালে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শন এবং দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার মতো দুঃসাহস সন্ত্রাসীরা কীভাবে পেল, তা কঠোরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। এর পেছনে থাকা ভূমিদস্যু, ইন্ধনদাতা ও সহযোগীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক না কেন, তা নির্মূল করতে হবে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে যারা চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থলও আমরা ধ্বংস করব।”
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুরে সিসিটিভি ক্যামেরা, পাহারাব্যবস্থা এবং সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। গত ৯ মার্চ পরিচালিত সমন্বিত যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সেই অবৈধ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসের কারণে অভিযানের মূল লক্ষ্য শতভাগ অর্জন করা সম্ভব হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “বিগত ১৭ বছরের দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি বা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভেতরে এক ধরনের ‘দুর্বৃত্তের রাষ্ট্র’ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। জঙ্গল সলিমপুর তার একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক অভিযানে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সামরিক বাহিনী এবং হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিয়েছেন। এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের পাশাপাশি বেতুয়া ও চা-বাগান এলাকাতেও সন্ত্রাসীদের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে পুরো অঞ্চলকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে পরিকল্পিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুধু জঙ্গল সলিমপুর নয়, সারা দেশেই মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ চারটি অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নির্মূলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জুয়া ও মাদকবিরোধী আইনি সংস্কারের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান জুয়া আইন দিয়ে আধুনিক ও অনলাইনভিত্তিক জুয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে আগামী সংসদ অধিবেশনে নতুন আইন বা সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কিশোর গ্যাং দমনে আইনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। এ বিষয়ে কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা জনগণের সরকার। জনগণের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব। বিভিন্ন কারণে এখানে বসবাসকারী প্রকৃত বাসিন্দাদের কাউকে আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না। প্রয়োজন হলে তাদের জন্য টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।”
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, শাহজাহান চৌধুরী, এরশাদ উল্লাহ, মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, মোহাম্মদ এনামুল হক, হুমাম কাদের চৌধুরী, সাঈদ আল নোমান, বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন, ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রমুখ।


