আর্থিক খাতে সংস্কার করতে না পারায় অর্থমন্ত্রীকে আইএমএফ খালি হাতে ফিরতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে মধ্যবিত্তের জন্য ‘মরণফাঁদ’ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পথের ফকির বানানোর বাজেট বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
এমপি আখতার হোসেন বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালের প্রকাশিত শ্বেতপত্র বলছে, দেশ থেকে ২৪০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। দেশ এখন খালি ঝুপড়ির মতো। এই সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকা, যা মাত্র কয়েক মাসে আরও ১ লাখ কোটি টাকা বেড়ে ২৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে এই সংসদেরই দুজন সদস্য এখনও শপথ নিতে পারেননি।”
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি পৌনে ১০ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার বাজেট ঘোষণার আগেই দুই দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মেকানিজম সম্পন্ন করে রেখেছে।
ব্যাংক খাতের নৈরাজ্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আখতার হোসেন বলেন, “ইসলামী ব্যাংকসহ যে ৫টি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, সেগুলোর আগের মালিকেরা লুটপাট ও টাকা পাচার করে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে। অথচ পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ওই মালিকেরা মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ টাকা ফেরত দিলে আবারও ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাবেন। যারা ব্যাংক দেউলিয়া করল, তাদেরই আবার ব্যাংক ফিরিয়ে দেয়ার ফায়দা কী?”
তিনি বলেন, “এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ যে এনবিআর গত অর্থবছরে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি তুলতে পারেনি, তাদের ওপর এই বোঝা চাপানো জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল। এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে এই ঘাটতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।”
বাজেটকে বিনিয়োগ পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে এনসিপি সদস্যসচিব বলেন, “ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলো থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। সরকার নিজেই সব টাকা নিয়ে নিলে প্রাইভেট সেক্টরে ঋণ বিতরণ হবে না। ফলে একটি ‘ক্রাউডিং ইফেক্ট’ তৈরি হবে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে স্থবির করে দেবে।”
কৃষি খাতে মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়াকে অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিডিপিতে কৃষির অবদান ৬২ শতাংশ থেকে নেমে ১০-১১ শতাংশে এসেছে। সার ও কীটনাশকের ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহারের সুবিধা কেবল ব্যবসায়ীরা পাবে, প্রান্তিক কৃষকেরা নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ট্যাক্স-ভ্যাট প্রত্যাহারকে সাধুবাদ জানালেও এনবিআরের এসআরও অনুযায়ী এই সুবিধা শুধু সরকারের সাথে চুক্তি করা বড় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা পাবেন বলে তিনি জানান। তিনি প্রান্তিক তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষক ও আবাসিক গ্রাহকদেরও এই সুবিধা দেয়ার দাবি জানান।
বক্তব্যের শেষ অংশে নিজের নির্বাচনী এলাকার বৈষম্যের কথা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, “রংপুর অঞ্চল বরাবরের মতোই অবহেলিত। হাটিকুমরুল-এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়কের বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় আরও কমানো হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার কোনো আলোচনাই বাজেটে নেই। গোটা রংপুর বিভাগের উন্নয়ন বরাদ্দ মাত্র ১ শতাংশে পর্যবসিত হয়।”


