শফিউল আলম, রাউজান: রমজান মাস শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর আসলে ঈদের পুর্বের দিন এক সময়ে প্রতিটি প্রতিটি ঘরে ঘরে গুড়া পিঠা তৈয়ারীর ধুম পড়তো। চাউলের গুড়া দিয়ে মহিলারা ঘরে বসে হাতে গুড়া পিঠা কটতো। চাউলের গুড়া দিয়ে তৈয়ারী করা গুড়া পিঠা চিনি দুৃধ ঘৃত নারিকেল কিচমিস বাদাম দিয়ে চুলায় রান্না করে ঈদের চাদঁ দেখা গেলে ফাতেহা দিয়ে তা পরিবারের সকলেই খেতেন। সুস্বাধু গুড়া পিঠা ঈদের দিন ও পরিবারের সকলেই ও আগত মেহমানরা খেয়ে আনন্দে মেতে উঠতো।
৬০ বছরের ঊর্ধ্বে নারী-পুরুষদের কাছে এখনো ঈদের প্রধান গুড়া পিঠা। সকালে নামাজ শেষে পরিবারের সবাই মিলে গুড়া পিঠা খাওয়ার সেই চিরচেনা দৃশ্য এখনো তাদের কাছে ঈদের আনন্দের অন্যতম অংশ। ৭০ বৎসরের বৃদ্বা, ছবিলা খাতুন বলেন গুড়া পিঠা ছাড়া ঈদের পূর্ণতা আসে না।অন্যদিকে বর্তমান সময়ের শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের পছন্দের তালিকায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তাদের কাছে ঈদের খাবার মানেই হালিম, বিরিয়ানি, কাস্টার্ড, ফালুদা, কেক-মিক্স ও পুডিংয়ের মতো আধুনিক ও বাহারি আইটেম।প্রবীণরা মনে করছেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে সেমাই ও গুড়া পিঠার প্রতি আগ্রহ বা রুচি নেই বললেই চলে। তারা বরং রেস্টুরেন্ট স্টাইল বা ভিন্নধর্মী খাবারের দিকেই বেশি ঝুঁকছে।এদিকে একসময়ে রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় ঈদের অন্যতম জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী নাস্তা ছিল গুঁড়া পিঠা।
ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার রাতেই গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে শুরু হতো এই পিঠা তৈরির আয়োজন। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই এতে অংশ নিতেন। কেউ চাল ভিজিয়ে গুঁড়া তৈরি করতেন, কেউ আবার পিঠার আকার দিতেন। এ যেন শুধু খাবার তৈরিই নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষও ছিল।গুড়া পিঠা তৈরির প্রক্রিয়াটিও ছিল বেশ যত্নসাধ্য। চালের গুড়া দিয়ে ছোট ছোট আকারে পিঠা বানিয়ে তা দুধ, চিনি ও নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি সিরার মধ্যে জ্বাল করা হতো। অনেক পরিবার আবার খেজুরের রস ব্যবহার করে পিঠার স্বাদ আরও বাড়িয়ে তুলতেন। এই পিঠার স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা ঈদের আমেজকে আরও বিশেষ করে তুলতো।কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, ব্যস্ত জীবনযাপন এবং সহজলভ্য ফাস্টফুড সংস্কৃতির কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী গুঁড়া পিঠা। এখন আর আগের মতো ঈদের চাঁদ রাতে পিঠা তৈরির সেই জমজমাট পরিবেশ চোখে পড়ে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পিঠার নাম পর্যন্ত ঠিকমতো জানে না। তারপর ও রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় এখনো ঈদের সময়ে গুড়া পিঠা তৈয়ারী করে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে কিছু মহিলানুর বেগ, আক্ষেপ করে জানান, আগে ঈদের আনন্দ মানেই ছিল পরিবারকে নিয়ে একসঙ্গে সময় কাটানো, নিজের হাতে পিঠা তৈরি করা। এখন সবকিছুই যেন বাজারনির্ভর হয়ে গেছে। তার মতে, এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে দেশীয় খাবারের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে।অনেকেই মনে করেন, আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ধরনের দেশীয় পিঠা-পুলি। তাই ঈদের মতো উৎসবগুলোতে এসব ঐতিহ্যবাহী খাবারকে আবারও ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। না হলে একটা সময় জনপ্রিয় গুড়া পিঠা কেবল স্মৃতির পাতায়ই থাকবে।


