মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, প্রিয় চট্টগ্রাম : বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, অন্যদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট—এই দুই বাস্তবতায় আগামী বাজেটে জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের অনিবার্য দাবি হয়ে উঠেছে। যদিও বিভিন্ন উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে এ খাতে অগ্রগতি হয়েছে, তবুও নীতিগত সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রায় ৬.৭১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন পেয়েছে। পাশাপাশি গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও ক্লাইমেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের সহায়তায় প্রায় ১৯৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ থাকলেও সময়মতো ছাড় না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের এক বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিও এখনো বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩৭.২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এ চাহিদা দাঁড়াবে ১০০ বিলিয়ন ডলারে। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩.২ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অত্যন্ত কম।
অন্যদিকে উচ্চ আমদানি শুল্কও এই খাতের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। সোলার প্যানেলে ২৭ শতাংশ এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর প্রায় ৩৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিপুল ভর্তুকি এবং ব্যাংকিং খাতে সাশ্রয়ী অর্থায়নের অভাব বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে সম্ভাবনাময় এ খাতেও কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।
নীতিগত দিক থেকেও রয়েছে বড় ঘাটতি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় অর্থায়ন কাঠামো সুস্পষ্ট নয়, উন্নয়ন লক্ষ্য ও প্রণোদনার বাস্তবায়ন দুর্বল, এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর কৌশলের অভাব রয়েছে। এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গড়ে ওঠেনি, যদিও আইএমএফ-আরএসএফ ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি এ উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে।
বিশ্বপরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রায় ১১.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশও জলবায়ু ঋণের পরিবর্তে অনুদান ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দ্বিপক্ষীয় কৌশল জোরদার করতে পারে।
অর্থায়নের নতুন পথ হিসেবে ডেট-ফর-ক্লাইমেট সুয়াপ, গ্রিন বন্ড এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের ১০ বিলিয়ন ডলারের গ্রিন বন্ড কর্মসূচি কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার ৮.৫ বিলিয়ন ডলারের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপ (ঔঊঞচ) এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদাহরণ।
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো মানসম্মত চুক্তির অভাব। পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (চচঅ) ও ট্যারিফ কাঠামোতে স্বচ্ছতা না থাকায় বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় থাকেন। পাশাপাশি বায়ুশক্তি খাত প্রায় অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে, যদিও উপকূলীয় অঞ্চলে এর বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা গেলে প্রায় ৪.৩৫৮ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব। এ অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে টেকসই পরিবর্তন আনা যাবে। একই সঙ্গে কার্বন ট্যাক্স ও দূষণ কর আরোপের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ সম্ভব, যা দিয়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে।
বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন হচ্ছে মোট সক্ষমতার খুবই সামান্য অংশ। যদিও একাধিক সৌর, বর্জ্য ও বায়ুশক্তি প্রকল্প চলমান রয়েছে, তবুও সামগ্রিক অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে বৈশ্বিক বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য শক্তিই ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হয়ে উঠছে।
এ প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের অভিমত—আগামী বাজেটে সুস্পষ্ট নীতি সহায়তা, কর ছাড়, স্বচ্ছ দরপত্র, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আকর্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। না হলে বাড়তে থাকা জ্বালানি সংকট এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরে এসে সবুজ জ্বালানির দিকে দ্রুত রূপান্তরই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র কার্যকর পথ।
বাজেটে জীবাশ্ম থেকে বের হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রাধিকার এখন সময়ের দাবি
সংবাদটি শেয়ার করুন
একটি মন্তব্য করুন
একটি মন্তব্য করুন


