আগামিকাল ৩ মে পটিয়ার ঐতিহ্যবাহী আমিরভান্ডার দরবার শরীফে মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, ‘আমিরুল আউলিয়া’ খ্যাত হযরত শাহসূফী সৈয়্যদ আমিরুজ্জমান শাহ (ক.)-এর বেছাল বার্ষিক ওরশ শরীফ যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে আমির মনজিলের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিনের শুরুতে খতমে কোরআন, জিকির-আজকার অনুষ্ঠিত হবে। বাদে মাগরিব খেয়াম, হামদ-নাত, সালাতু সালাম পরিবেশন করা হবে। বাদে এশা তাঁর জীবন, দর্শন ও আধ্যাত্মিক কীর্তি নিয়ে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। রাত ১১টার পর ভান্ডারী সংগীতের আসর বসবে। সর্বশেষ দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় আখেরী মোনাজাত এবং তবারুক বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটবে। আমির মনজিল’র মাহফিলে সভাপতিত্ব করবেন আওলাদে আমিরভান্ডারের সাজ্জাদাশীন হযরতুল হাজ্ব শাহসূফী সৈয়্যদ মুহাম্মদ শামুন শাহ আমিরী (ম.)।
সংক্ষিপ্ত জীবনী: হযরত সৈয়্যদ আমিরুজ্জমান শাহ (ক.) এক মহিমান্বিত সৈয়্যদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত সৈয়্যদ হামিদ উদ্দীন গৌড়ী (র.) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যিনি গৌড় নগর থেকে চট্টগ্রামে আগমন করে দ্বীনি খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে বহু আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে, যার মধ্যে অন্যতম হলেন গাউসুল আ’যম হযরত আহমদ উল্লাাহ মাইজভান্ডারী (ক.) এবং আমিরুল আউলিয়া হযরত আমিরুজ্জমান শাহ (ক.)। হযরত আমিরুজ্জমান শাহ (ক.)-এর পিতা ছিলেন হযরত কাজী সৈয়্যদ মওলা চাঁদ শাহ (রহ.), যিনি সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মাতা শামসুন নাহার বেগম ছিলেন ধার্মিক, পরহেজগার এবং পর্দানশীন এক মহীয়সী নারী। তাঁদের দোয়ার ফলেই এই মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
জন্ম ও শৈশব: হযরত সৈয়্যদ আমিরুজ্জমান শাহ (ক.) ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে (১লা চৈত্র, ১২৫২ বঙ্গাব্দ) চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার গোবিন্দারখীল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও ধর্মপ্রাণ। অন্য শিশুদের মতো খেলাধুলায় মেতে না উঠে তিনি অধিকাংশ সময় চিন্তামগ্ন থাকতেন। চার-পাঁচ বছর বয়সে তাঁর মা তাঁকে মাদ্রাসায় ভর্তি করান। সেখানে তিনি কোরআন, হাদিস, আরবি, ফার্সি ও উর্দু শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যার সান্নিধ্যে তিনি প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করেন।
কিন্তু অল্প বয়সেই তাঁর পিতার ইন্তেকাল ঘটে, ফলে পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে তিনি কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। এই সময় একদিন আধ্যাত্মিক সাধক হযরত সৈয়্যদ আকবর শাহ (রহ.) তাঁকে কৃষিকাজ করতে দেখে বলেন, “তুমি এ কাজের জন্য সৃষ্টি হওনি।” এই ঘটনাটি তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন।
কৈশোর ও আধ্যাত্মিক সাধনা: হযরত সৈয়্যদ আমিরুজ্জমান শাহ (ক.) মাতার ইন্তেকালের পর তাঁর জীবনে এক নতুন মোড় আসে। তিনি সংসার থেকে বিমুখ হয়ে ইবাদত-বন্দেগীতে অধিক মনোযোগী হন। মাঝে মাঝে ঘর ছেড়ে বিভিন্ন মসজিদ ও মাজারে অবস্থান করতেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি বিভিন্ন পীর ও ওলির সান্নিধ্যে যান। রাউজানের হযরত মাওলানা আবদুল আজিজ শাহ (র.)-এর কাছে কিছুদিন শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বড়লিয়া ও আনোয়ারার বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকেও মারফতের জ্ঞান অর্জন করেন।
অবশেষে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু তাঁকে মাইজভান্ডারের গাউসুল আ’যম হযরত আহমদ উল্লাহ (ক.)-এর সান্নিধ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার পূর্ণতা লাভ করেন।
বিবাহিত জীবন: হযরত আমিরুজ্জমান শাহ (ক.) তিনটি বিবাহ করেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী হযরত ওয়াজ খাতুন (র.) ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ নারী। তিনি শুধু স্ত্রী হিসেবেই নয়, পীর হিসেবেও তাঁর স্বামীকে গ্রহণ করেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনায় পূর্ণ সহযোগিতা করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী হযরত ফাতেমা খাতুন (র.)ও একইভাবে তাঁর সাধনায় সহায়তা করেন। তৃতীয় স্ত্রী হযরত লাইলা জান খাতুন (র.)-কে তিনি ৬৩ বছর বয়সে বিবাহ করেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি তাঁর ছয় পুত্রকে ‘ছয়টি ফুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাঁদের মাধ্যমে তাঁর তরিকতের বিস্তার ঘটে।
আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য: হযরত আমিরুজ্জমান শাহ (ক.) ছিলেন একজন উচ্চমার্গের সাধক। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ এবং মানবতার কল্যাণ সাধন। তিনি ইবাদত, ত্যাগ ও ধৈর্যের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছান। তিনি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করেন এবং অসংখ্য মানুষ তাঁর মাধ্যমে হেদায়েত লাভ করেন। তাঁর দরবার আজও আধ্যাত্মিক সাধনার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ইন্তেকাল: ১৯২৭ সালের ৩ মে (১২ জিলক্বদ, ২০ বৈশাখ) সকাল ১০টায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর মাজার ও দাফন সংক্রান্ত কিছু নির্দেশনা দিয়ে যান, যা তাঁর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। তাঁর জানাযায় অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগীর সমাগম ঘটে। তাঁর বড় ছেলে হযরত সোলায়মান শাহ (রহ.) জানাযার ইমামতি করার কথা থাকলেও অতিরিক্ত আবেগে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
উপসংহার: হযরত আমিরুজ্জমান শাহ (ক.) ছিলেন এক বিরল আধ্যাত্মিক সাধক, যার জীবন ত্যাগ, ইবাদত ও মানবকল্যাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আমিরভান্ডার দরবার আজও অসংখ্য মানুষের আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল। প্রতিবছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবসে ওরশ শরীফ উপলক্ষে ভক্তরা একত্রিত হয়ে তাঁর জীবনাদর্শ স্মরণ করেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দোয়া করেন। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে অনুপ্রেরণা জোগায়।


