চট্টগ্রাম, বুধবার: চট্টগ্রাম নগরীর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয়, জবাবদিহিমূলক ও মাঠমুখী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
বুধবার (২০ মে) টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ের সভাকক্ষে রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র বলেন, “চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন খাতে রাজস্ব আদায় এখনো সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। এ অবস্থা পরিবর্তনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলতা ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে।”
সভায় উপস্থিত ছিলেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামাল, রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সাব্বির রহমান সানি, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরীসহ রাজস্ব বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।
সভায় উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব এখনো আদায়ের বাইরে রয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি, কর ফাঁকির প্রবণতা এবং রাজস্ব বিভাগের লজিস্টিক ও জনবল সংকটকে এই অবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সভায় প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামাল বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত পরিমাণ কর আদায় সম্ভব হয় না। যেমন রেলওয়ের ক্ষেত্রে প্রতি বছর প্রায় ২০ কোটি টাকা পাওনা থাকলেও বাজেটে কম বরাদ্দ থাকায় তা পর্যাপ্ত পরিমাণে আদায় করা যাচ্ছে না, ফলে বকেয়া জমে বাড়ছে। এভাবে জমতে জমতে রেলওয়ে থেকে পাওনা ৫৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, রাজস্ব আদায়ে কাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে, বিশেষ করে বাজেট প্রণয়নের সময় গৃহকরের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ কর পরিশোধ করতে পারে না। এছাড়া জনবল সংকটও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এ প্রেক্ষিতে নির্দেশনা দিয়ে মেয়র বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর কাছেও চসিকের বিপুল পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। এসব বকেয়া আদায় না হলে সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হবে না।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বকেয়া আদায়ের জন্য অবিলম্বে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের কাছে ডিও (DO) লেটার প্রস্তুত করে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ফাইভ স্টার হোটেল, মার্কেট, গার্মেন্টস কারখানা ও কন্টেইনার ডিপোগুলোর হোল্ডিং ট্যাক্স দ্রুত পুনর্মূল্যায়ন (রি-অ্যাসেসমেন্ট) করতে হবে।
কর আদায়ে কোনো ধরনের শিথিলতা বরদাশত করা হবে না উল্লেখ করে মেয়র বলেন, “আমি ট্যাক্সের ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেব না। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিশোধ করছে না, তাদের তালিকা তৈরি করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনায় প্রতি মাসের শুরুতে নিয়মিত সমন্বয় সভা করে আমাকে অগ্রগতি জানাবেন।”
সভায় রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্যান্টনমেন্ট ও ইপিজেড এলাকায় আইনি জটিলতার কারণে কর আদায়ে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে সভায় বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—সরকারি বকেয়া আদায়ে ডিও লেটার প্রেরণ, বাণিজ্যিক স্থাপনার পুনর্মূল্যায়ন, ইপিজেড এলাকার করযোগ্যতা যাচাই, বড় করখেলাপিদের তালিকা প্রণয়ন, জনবল সংকট নিরসনে পদায়ন, কর সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কর্মীদের প্রণোদনা প্রদান।
মেয়র বলেন, “নগরবাসীর করের টাকাই নগর উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব।”


