শফিউল আলম, রাউজান: চট্টগ্রাম জের্লাা রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে উপজেলার পাহাড়তলী এলাকায় এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।নিহত ব্যক্তির নাম মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ (৪০) রাঙ্গুনিয়া উপজেলার উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের বেতাগী এলাকার খালেদ চৌধুরীর পুত্র। দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত মাসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ন আহবায়ক। স্থানীয়রা জানান, দুপুরের সময় পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থানকালে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত দল মাসুদকে লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে। যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে সশস্ত্র দুবৃত্তরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। ঘটনার খবর পেয়ে রাউজান থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং লাশ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য তদন্ত চলছে। যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্য্কাান্ডের সংবাদ পেয়ে রাঙ্গুনিয়া বেতাগী ও রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি, যুবদল ছাত্রদল সহ সাধারন মানুষ রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকায় এসে হত্য্কাান্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম কাপ্ত¦াই সড়ক অবরোধ করে খুনিদের গ্রেফতারের দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল করে। এসময়ে চট্টগ্রাম কাপ্তাই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্দ্ব হয়ে যায়।
যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকান্ডের ঘটনার সংবাদ পেয়ে রাউজান রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বেলায়েত হোসেন ও রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলাম রাউজান থানার পুলিশ সহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বেলায়েত হোসেন বলেন,সশস্ত্র হামলাকারীরা মাসুদুল হককে মাথায় গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। গুলির আঘাতে তার মাথার খুলি উড়ে যায়। তিনি আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। এটি রাজনৈতিক বিরোধ নাকি ব্যক্তিগত শত্রুতা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেকেই এই ধরনের প্রকাশ্য সহিংস ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা সম্ভাব্য সব কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।রাউজানের এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
স্থানীয়রা জানায়, গত ২৫ মাস ধরে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে রাউজান। প্রায় ঘরে ঘরে রয়েছে অবৈধ অস্ত্র। পুরোনো সন্ত্রাসীরা আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে চাইছে উঠতি সন্ত্রাসীরা। ফলে পান থেকে চুন খসলেই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। এসব সন্ত্রাসীকে নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক উদ্যোগ নেই বললেই চলে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি সন্ত্রাসী গ্রুপের ওপর কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার আশীর্বাদ থাকায় পুলিশও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। যদিও এ অভিযোগ কখনোই স্বীকার করেনি প্রশাসন।
যুবদল নেতা নাছির উদ্দিন, কাউসারুজ্জামান হত্যকান্ডের ঘটনার পর পাহাড়তলী চৌমুহনীতে প্রকাশ্য দিবালোকে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্য্কাান্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৩ জুন শনিবার দুপুরে । গত ২৫ মাসে শুধু রাউজানেই ২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে ২৮ আগস্ট। ওইদিন বিকালে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে। তিনদিন পর ১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে ইউসুফ মিয়া নামে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর নিখোঁজের চারদিন পর উরকিরচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মইশকরম এলাকার একটি আবর্জনার ডোবা থেকে মুহাম্মদ আজম খানের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১১ নভেম্বর তিনদিন আগে নিখোঁজ হওয়া মুহাম্মদ আবু তাহেরের লাশ চিকদাইর ইউনিয়নের কালাচান্দ চৌধুরীহাট এলাকার বড়পুল সর্তাখাল থেকে উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আছাদ আলী মাতব্বরপাড়ায় শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে নোয়াপাড়া থেকে যুবলীগকর্মী মোহাম্মদ হাসানকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা।
২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের মারধর ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন কমর উদ্দিন জিতু নামে এক যুবদলকর্মী। একই বছরের ২১ মার্চ পূর্বপুজরা ইউনিয়নের হোয়ারাপাড়ায় মো. রুবেল নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ এপ্রিল হলদিয়া ইউনিয়নের ইয়াছিননগরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে নূর আলম বকুলকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ১৭ এপ্রিল পাহাড়তলী ইউনিয়নের মহামুনি দীঘি থেকে খানপাড়া গ্রামের মো. জাফরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৯ এপ্রিল রাতে খুন হন যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহ। ১৫ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী ভাত খাওয়া অবস্থায় তার মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। ২২ এপ্রিল দোকানে ডেকে এনে মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় সদর ইউনিয়নের শমশেরনগর গাজীপাড়া এলাকার যুবদল নেতা মো. ইব্রাহিমকে। ৬ জুলাই কদলপুর ইউনিয়নের ইশানভট্টের হাটবাজারে অটোরিকশায় করে এসে বোরকাপরা একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মুহাম্মদ সেলিম নামে এক যুবদলকর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে।
১০ জুলাই রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের যুবদলকর্মী দিদারুল আলমের লাশ রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার একটি ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়। ৭ অক্টোবর রাউজানের যুবদল নেতা আবদুল হাকিমকে হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় মুখোশ পরা একদল সন্ত্রাসী চলন্ত গাড়িতে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করে। ২৫ অক্টোবর রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম রাউজানের চারাবটতল এলাকার কায়কোবাদ জামে মসজিদের সামনে যুবদল নেতা মো. আলমগীর ও মো. রিয়াদকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাটে মানসিক প্রতিবন্ধী রূপন নাথকে হত্যার পর মাটিচাপা দেয় দুর্বৃত্তরা। যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে পূর্বগুজরা এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত গুলি করে হত্যার পর পালিয়ে যায়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অলিমিয়াহাট বাজারে বিএনপিকর্মী মুজিবকে ইফতারের আগে গুলি করে হত্যার পর অটোরিকশায় পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ১৩ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী থেকে গ্রাম্যমেলা দেখে ফেরার সময় উরকিরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সাব্বিরকে পিটিয়ে হালদা নদীতে ফেলে দেয় সন্ত্রাসীরা। তিনদিন পর ১৬ ফেব্রুয়ারি তার লাশ উদ্ধার করা হয়।গত ২৫ এপ্রিল রাত ৩টার দিকে বিএনপিকর্মী কাউসার উজ জামানকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। মামাবাড়ি যাওয়ার সময় ৮-১০ জনের একদল সন্ত্রাসী তাকে ঘিরে ধরে গুলি করে হত্যা করে। সবশেষ গত ২৬ এপ্রিল যুবদলকর্মী নাছের তালুকদারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।


