শফিউল আলম, রাউজান ঃ পৌষের শেষ আর মাঘের শুরু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রতি বছর শীত আসে। ২০২৬ সালের এই শীত যেন কোনো সাধারণ ঋতু পরিবর্তন নয়, বরং এটি খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এক মূর্তিমান যমদূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে গোটা বাংলাদেশ। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও সূর্যিমামার দেখা মেলা ভার। হিমালয় থেকে ধেয়ে আসা হিমশীতল হাওয়া হাড়ের ভেতরে গিয়ে কামড় বসাচ্ছে। এই হাড়কাঁপানো শীতে যখন সামর্থ্যবানেরা ঘরের উষ্ণতায় লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে সময় পার করছেন, তখন দেশের কোটি কোটি তৃণমূল মানুষের জীবন-জীবিকা আজ লণ্ডভণ্ড। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক এবং কৃষিশ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে এক চরম ও অসহনীয় সংকট। এটি কেবল আবহাওয়ার বার্তা নয়, এটি আজ এক মানবিক বিপর্যয়ের হাতছানি।
কাজের বাজারে হাহাকার: স্থবির অর্থনীতি প্রচন্ড শীত ও কুয়াশার কারণে চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি মহাসড়ক সহ রাউজানের বিভিন্ন সড়কে যানবাহন দিনের বেলাতে বাতি জালিয়ে চালাতে হচ্ছে দৃষ্টিসীমা এতটাই কমে এসেছে যে, দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন চালকরা। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। ভোরে কুয়াশার বুক চিরে যারা কাজের সন্ধানে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী কিংবা দেশের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এসে জড়ো হতেন, আজ তারা সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক বুক হতাশা আর অলস সময় নিয়ে। কাজ দেওয়ার মতো কেউ নেই। নির্মাণ কাজ বন্ধ কারণ সিমেন্ট-বালুর হিমশীতল স্পর্শে শ্রমিকদের হাত অবশ হয়ে যাচ্ছে।
রাাউজানের ফকির হাট বাজারে কৃষি কাজ করতে ছুটে এসেছে নেত্রকোনার আবুল কালাম। কৃষি শ্রমিক আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, বাপরে, এমন শীত আগে দেহি নাই। হাত-পা থরথর কইরা কাঁপে। কাজ করে যে টাকা উর্পাজন করি তা দিয়ে পরিবার পরিজনের ব্যায়ভার বহন করি। রাউজানের হলদিয়া ইউনিয়নের কৃষক নুরুল আলমের জমিতে কাজ করতে য্য়া। প্রচন্ড শীত ও ঘনকুশার মধ্যে বোর সকালে জমিতে বোরো ধানের চালা রোপন করার জন্য বীজতলা থেকে বোরো ধানের চারা তুলছে। হলদিয়া বৃকবানুপুর এলাকার কৃষক শাহ আলম প্রচন্ড শীতের মধ্যে বোরো ধানের চারা রোপন করার জন্য জমিতে পাওয়ার টিলার দিয়ে হাল চষে জমি তৈয়ারী করছেন।
কৃষি ও গ্রামীণ জনপদে হাহাকার শহরের চেয়েও গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও বেশি শোচনীয়। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এখন ঘন কুয়াশার চাদরে বন্দি। বোরো ধান রোপণের এই ভরা মৌসুমে কৃষিশ্রমিকরা মাঠে নামতে পারছেন না। কনকনে ঠান্ডা পানিতে নেমে ধানের চারা রোপণ করা এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একদিকে যেমন কৃষিশ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে দেশের খাদ্য উৎপাদন। কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ যদি সময়মতো চারা রোপণ করা না যায়, তবে আগামী মৌসুমে ফসলের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। শীতের এই কামড়ে শুধু মানুষেরই ক্ষতি হচ্ছে না, গবাদি পশুর অবস্থাও করুণ। খড়কুটো জ্বালিয়ে গোয়াল ঘরে উষ্ণতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না।
বিচূর্ণ জীবন ও ছিন্নভিন্ন স্বপ্ন তীব্র ঠান্ডায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আজ পুরোপুরি বিচূর্ণ। বিশেষ করে নদী অববাহিকার চরাঞ্চল ও বস্তি এলাকার মানুষের কাছে এই শীত যেন এক অভিশাপ।তাদের ঘরে নেই পর্যাপ্ত আসবাবপত্র, নেই শীত নিবারণের ন্যূনতম ব্যবস্থা। ফুটপাতে শুয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষগুলো ছিঁড়ে যাওয়া বস্তা কিংবা প্লাস্টিক গায়ে দিয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করছেন। আগুনের কুণ্ডলী জ্বালিয়ে একটু তাপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে, কিন্তু সেই আগুনেই অনেক সময় অসাবধানতাবশত ঘটছে অগ্নিকাণ্ড।
সরকারি ও বেসরকারিভাবে যেসব ত্রাণ বা শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়, তাকে ‘সমুদ্রের মাঝে শিশির বিন্দুর মতো’ মনে করছেন সাধারণ মানুষ। এক প্রকার ক্ষোভ নিয়ে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিবছর দেখি শীতে সাহায্য আসে। টিভিতে দেখি কম্বল দিচ্ছে। কিন্তু আমাগো নসিবে জোটে না। আর যা দেয়, তা তো পাতলা চাদরের মতো। দাপুটে শীতের কাছে ওই একটা পাতলা কম্বল কিছুই না। পেটে ভাত না থাকলে শরীর গরম থাকে কী দিয়া? কথাটি ধ্রুব সত্য খালি পেটে শীতের কামড় কয়েকগুণ বেশি তীব্র হয়ে অনুভূত হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: মৃত্যুর দোরগোড়ায় শিশু ও বৃদ্ধরা শীতের এই ভয়াবহতার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতকালীন রোগবালাই। নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, শ্বাসকষ্ট এবং কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। গরিব মানুষের পক্ষে দামি দামি অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা ইনহেলার কেনা অসম্ভব। একবেলা খাবারের পয়সা জোগাড় করাই যেখানে দায়, সেখানে ওষুধের বাড়তি খরচ যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। চিকিৎসকরা বলছেন, যদি এখনই পর্যাপ্ত উষ্ণতা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা না যায়, তবে শীতজনিত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে পারে।
ত্রাণ বনাম অধিকার: সরকারের প্রতি তৃণমূলের দাবি তৃণমূলের মানুষেরা এখন দয়া চান না, তারা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার চান। সরকারের কাছে তাদের আকুল আবেদন—কেবল ফটোসেশন করার জন্য কয়েকটা কম্বল বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের দাবিগুলো নিম্নরূপ:পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শীতবস্ত্র: নামমাত্র পাতলা কম্বল নয়, বরং মোটা কম্বল এবং লেপ প্রদান নিশ্চিত করা।জরুরি খাদ্য সহায়তা: যারা কাজ হারিয়ে ঘরে বসে আছেন, তাদের জন্য বিশেষ রেশনিং বা ওএমএস (ওএমএস) এর মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা।
বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ: প্রতিটি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করে শীতকালীন রোগের ঔষধ বিনামূল্যে দেওয়া।কর্মসংস্থান ও ঋণ সহায়তা: ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বিনাসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যাতে তারা শীত শেষে আবার উঠে দাঁড়াতে পারেন।
বিত্তবান ও নাগরিক সমাজের দায়বদ্ধতা সংকট কেবল সরকারের একার নয়। যখন দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, তখন বিত্তবান শ্রেণি এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) থেকে এগিয়ে আসা উচিত। আমরা দেখি উৎসবে-পার্বণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়, অথচ আজ আমাদের পাশের প্রতিবেশীটি শীতে কাঁপছে। প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষ যদি অন্তত একজনের দায়িত্ব নেন, তবে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার পরীক্ষাপ্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে রুদ্রমূর্তি ধারণ করবেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের এই তীব্রতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে আমরা কতটা প্রস্তুত? যখন একজন নাগরিক হতাশায় বলেন ‘মরণ ছাড়া উপায় নাই’, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে।শীতের এই দাপট হয়তো কয়েক সপ্তাহ পর কমে যাবে, কিন্তু এই দিনগুলোতে যে মানুষগুলো অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন, তাদের মনের ক্ষত সহজে শুকাবে না। ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষের হাহাকার যেন আমাদের জাতীয় বিবেককে দংশন করে। আসুন, কেবল সমবেদনা নয়, সক্রিয় পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই। দাপুটে শীতের কবল থেকে এই মানুষগুলোকে বাঁচাতে হলে এখনই সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ প্রয়োজন। আজকের এই মানবিক বিপর্যয়ে যদি আমরা হাত বাড়িয়ে না দিই, তবে ইতিহাসের পাতায় এই শীত কেবল ঠান্ডার জন্য নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত অমানবিকতার এক কালো অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাউজান উপজেলা সহকারী কমিশনার ভুমি ভারপ্রাপ্ত রাউজান পৌর প্রশাসক অংছিং মারমা বলেন, দিনমজুর, কৃষি শ্রমিক, রিক্সা চালক ভ্যান চালক, অসহায় দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রাউজান পৌরসভা থেকে কম্বল বিতরন করা হয়েছে।


