মোঃ নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই(রাঙামাটি): বনখেকো ও পাচারকারীদের লোলুপ দৃষ্টি সহ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কাপ্তাই বন রেঞ্জে টিকে আছে শতবর্ষী শতাধিক ‘মাদার ট্রি’ বা ‘মা গাছ’। মাদার ট্রি (Mother Tree) বলতে ৪০-১০০ বছর বয়সী প্রধানত বনের সবচেয়ে পুরোনো এবং বড় গাছগুলোকে বোঝায়। যা একটি বিশাল ভূ-গর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরো বনের বাস্তুসংস্থানকে টিকিয়ে রাখে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ‘মাদার ট্রি’ বা ‘মা গাছ’ এর ভূমিকা অপরিসীম। মাদার ট্রি হলো বনের প্রাণ। যা প্রাকৃতিক নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। একটি বনের সবচেয়ে পুরনো, বড় এবং সবচেয়ে বেশি শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট গাছগুলোই হচ্ছে ‘মাদার ট্রি’। কাপ্তাই বন রেঞ্জ এলাকায় টিকে থাকা মাদার ট্রি গুলো হলো-গর্জন, পীতরাজ, ছাতিয়ান, শিমুল, চন্দুল, রং-গামার, অশ্বথ, সুরুজ, বান্দরহোলা, চিকরাশি, বাটনা, গুটগুটিয়া, রক্তন, লোহাকাঠ, পুতিজাম, হুক্কানালি, উরিআম, জগডুমুর, ভাদি, চাপালিশ ইত্যাদি।

শত প্রতিকুলতার মাঝেও শতাধিক মাদার ট্রির সন্ধান মিলেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের কাপ্তাই বন রেঞ্জে। এরমধ্যে অনেকগুলো গাছের আয়ুষ্কাল প্রায় ১০০ বছর। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাপ্তাই বন রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ ওমর ফারুক স্বাধীন। এবিষয়ে তিনি বলেন, অনেকেরই ধারণা, কাপ্তাই রেঞ্জে মাদার ট্রি হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে আশার আলো হচ্ছে, রেঞ্জের আওতাধীন বনের বিভিন্ন অংশে সার্ভে করে অন্তত ১০০টি শত বছরের পুরনো মাদার ট্রির সন্ধান পাওয়া গেছে। কাপ্তাই বন রেঞ্জের সীতাপাহাড় ছাড়াও এই মাদারট্রির দেখা পাওয়া গেছে রামপাহাড় সহ কাপ্তাই রেঞ্জের গহীন অরণ্যে। যে গাছগুলো একেকটির বয়স ৫০-১০০ বছরের অধিক। সুঠাম দেহী, ডালপালা সমহারে বেষ্টিত ও সুস্থবীজ উৎপাদনকারী হিসেবে বেশ পরিচিত এসব মাদার ট্রি। তিনি বলেন, বর্তমানে কাপ্তাই বন রেঞ্জে সংরক্ষণ করে রাখার মতো অনেকগুলো পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির মাদারট্রি বেঁচে রয়েছে। এসব মাদার ট্রি থেকে বীজ সংগ্রহ করে পুরো কাপ্তাই উপজেলাকে সবুজে ভরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
এসব মাদার ট্রি সুরক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে রেঞ্জ কর্মকর্তা ওমর ফারুক স্বাধীন জানান, বর্তমানে প্রতিনিয়ত বনে গিয়ে এই মাদার ট্রি সুরক্ষায় দেখভাল করা হচ্ছে। যেখানে সার্বক্ষণিক নির্দেশনা ও তত্বাবধান করে যাচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, এসব গাছ টিকে থাকলে বন টিকে থাকবে। এসব গাছের সুরক্ষায় বনবিভাগ নিয়মিত টহল জোরদার করে গাছগুলো পরিচর্যা করে যাচ্ছে। সুপ্রাচীন ও শত বছরের গাছগুলো রক্ষা করার জন্য বনবিভাগের পাশাপাশি সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। বন উজাড় কিংবা বনের গাছ নিধন থেকে অসাধু মানুষদের সরে আসতে হবে। মাদার ট্রি না বাঁচলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। তাই বন সুরক্ষায় সকলকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।

প্রসঙ্গত, মাদার ট্রির মূল বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলী সম্পর্কে জানা গেছে, মাদার ট্রি কেবল একটি বড় গাছ নয়, এটি বনের ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দু। এর প্রধান কাজ হচ্ছে পুষ্টি ও তথ্য আদান-প্রদান করা। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, মাটির নিচে ছত্রাকের এক ধরনের নেটওয়ার্ক (Mycorrhizal network) থাকে। একে বলা হয় “Wood Wide Web”। মাদার ট্রি এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বনের ছোট ও দুর্বল চারা গাছগুলোকে চিনি, জল ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাঠায়। সে সাথে গভীর অরণ্যে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছানো কঠিন, সেখানে মাদার ট্রি তার বিশাল পত্রপল্লবের ফাঁক দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করে এবং নিজের শিকড় থেকে পুষ্টি পাঠিয়ে ছোট চারাগুলোকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। যখন কোনো গাছ পোকা বা রোগে আক্রান্ত হয়, তখন মাদার ট্রি সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্য গাছগুলোকে রাসায়নিক সংকেত পাঠিয়ে সতর্ক করে দেয়, যাতে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে পারে। তাছাড়া মাদার ট্রি প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখে, যা পুরো এলাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। একটি মাদার ট্রি মারা গেলে বা কেটে ফেলা হলে কেবল একটি গাছ নষ্ট হয় না, বরং পুরো বনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এরফলে বনের চারাগাছ গুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। তাই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বনের পুনর্জন্ম নিশ্চিত করতে মাদার ট্রি সংরক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন।


