মির্জা ইমতিয়াজ শাওন: বাংলাদেশের পরিবহন খাত দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ভোক্তা। বিভিন্ন সরকারি ও খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট তরল জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬২ থেকে ৬৩ শতাংশ ব্যয় হয় পরিবহন খাতে। এই খাতে প্রধানত ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও সিএনজি ব্যবহার করা হলেও এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি চাহিদা পূরণ করে ডিজেল, যা বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান এবং অন্যান্য ভারী পরিবহনের প্রধান জ্বালানি।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আমদানি করা মোট জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হিসেবে দেশে আসে, যা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধন করা হয়। অপরদিকে প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি সরাসরি পরিশোধিত পণ্য হিসেবে আমদানি করতে হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে।
জ্বালানি আমদানির এই উচ্চ নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই দেশের অর্থনীতিতে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে।
সরকারের জ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানির প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বছরের প্রথমার্ধের জন্য প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পুরো বছরের মোট আমদানি চাহিদা ও দ্বিতীয়ার্ধের পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং তা পরবর্তীতে নির্ধারিত হবে।
এ বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থার প্রসার শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বৈদ্যুতিক যানবাহন, হাইব্রিড প্রযুক্তি, আধুনিক গণপরিবহন এবং রেলভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটলে পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হবে। ফলে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
পরিবেশবান্ধব পরিবহনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে দেশের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হলো যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর গ্যাস। বৈদ্যুতিক ও জ্বালানি দক্ষ যানবাহনের ব্যবহার বাড়লে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ক্ষুদ্র বস্তুকণার নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় ব্যয়ও কমবে।
একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পরিবহন খাত নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। বৈদ্যুতিক যানবাহন সংযোজন শিল্প, ব্যাটারি উৎপাদন, চার্জিং স্টেশন নির্মাণ, সফটওয়্যারভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ সেবার মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও এটি একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সবুজ অর্থায়ন, জলবায়ু তহবিল এবং কার্বন ক্রেডিট সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্রেও পরিবেশবান্ধব পরিবহন খাতকে কাজে লাগাতে পারে। বৈশ্বিকভাবে এখন টেকসই পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হবে।
এছাড়া নগর ব্যবস্থাপনায় বৈদ্যুতিক বাস, মেট্রোরেল, বিআরটি, আধুনিক রেলপথ এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন সম্প্রসারণের মাধ্যমে যানজট কমানো সম্ভব হবে। যানজটের কারণে প্রতিদিন যে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং জ্বালানি অপচয় ঘটে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যানজটজনিত ক্ষতি প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। দক্ষ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী গণপরিবহন সেই ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত নতুন যানবাহনের ব্যবহার সীমিত বা বন্ধ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশও যদি এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তবে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তাই এবারের জাতীয় বাজেটে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবহন খাতকে কর রেয়াত, শুল্ক সুবিধা, স্বল্পসুদে ঋণ, চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণে প্রণোদনা এবং দেশীয় উৎপাদনে বিশেষ সহায়তার মাধ্যমে অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি। কারণ পরিবহন খাতে সামান্য জ্বালানি সাশ্রয়ও জাতীয় পর্যায়ে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে দূষণ কমবে, জনস্বাস্থ্য উন্নত হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং টেকসই সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।
জাতীয় বাজেট কেবল রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা। সেই রূপরেখায় পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবহন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে যৌক্তিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।


