“ছোট খাটো চাইঙ্গা ঠাকুর এত বুদ্ধি জানে,
রোসাং থেকে মহামুনি কদলপুরে আনে।”
শফিউল আলম, রাউজান: অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে (আনুমানিক ১৭৮০ সালে এ প্রবাদের প্রচলন হয়েছিল রাউজানের পাহাড়তলী এলাকার মহামুনি বৌদ্ধ মন্দিরকে ঘিরে। চট্টগ্রামে যে কয়েকটি বৌদ্ধ অধ্যূষিত গ্রাম দেখা যায় এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রাউজান উপজেলার মহামুনি পাহাড়তলী নামের গ্রামটি। সংক্ষেপে বলা হয় মহামুনি। ‘মহামুনি’ শব্দের অর্থ মহামানব অর্থাৎ এখানে গৌতম বুদ্ধকে নির্দেশ করা হয়েছে। মহামানব গৌতম বুদ্ধের মূর্তি এখানে স্থাপিত বলে এর নামকরন হয়েছে ‘মহামুনি মন্দির’। মূর্তিটির জন্য গ্রামটির নাম হয়ে যায় ‘মহামুনি’। স্থানটির চারদিকে পাহাড় ঘেরা ও জনবসতি পাহাড়ের তলে হওয়ায় গ্রামটির পূর্ণাঙ্গ নাম ‘মহামুনি পাহাড়তলী’।
চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের পাহাড়তলী গ্রামের ঠিক মধ্যস্থলে একটি অনুচ্চ টিলার উপর বিহারটি অবস্থিত। এ বিহারটি প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে মতবিরোধ আছে।কারও ধারণা, ১৮১৩ সালে পুণ্যাত্মা ভিক্ষু চাইংঙ্গা ঠাকুর স্বগ্রামবাসীর সামগ্রিক সহায়তায় এ বিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ডঃ রামচন্দ্র বড়ুয়ার মতে, মহামুনি মূর্তি ও মন্দির ১৮০৫ সালে নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন “ ১২৬৭ মগাব্দের ১০০ বছর পূর্বে (১৮০৫ খ্রিঃ) মহামুনি মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে”( চট্টগ্রামের মগের ইতিহাস প্রাগুক্ত, পৃ, ১৬।) এমনতাবস্থায় নিঃসন্দেহে বলা যায় উনবিংশ শতকের প্রথম দুদশকের মধ্যেই এ বিহার ও মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে (আনুমানিক ১৭৮০ সালে ) চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার কদলপুর তথা, মহামুনি গ্রামের প্রাজ্ঞ বৌদ্ধভিক্ষু চাঁইঙ্গাঠাকুর প্রকাশ চাঁইঙ্গা ঠাকুর ধর্মদর্শনে শিক্ষা লাভের জন্য বার্মা বর্তমান মায়ানমার যান এবং শিক্ষা শেষে তীর্থস্থান ভ্রমণোপলক্ষে আরাকান (অপর নাম রোসাঙ্গ) আসেন।
আরাকানের ম্রিহং গেলে সেখানকার ‘মহামুনি মূর্তি’ দেখে তিনি এতই অভিভূত হন যে নিজ গ্রামে ‘মহামুনি মূর্তি’ প্রতিষ্টা করার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন। কথিত আছে এক সময় গৌতম বুদ্ধ আরাকান এসেছিলেন। তাঁকে দেখে শিল্পীরা স্মৃতি থেকে তাঁর মূর্তি তৈরি করেন। বলা হয়ে থাকে মূর্তিটি গৌতম বুদ্ধের মূল চেহারার সাথে সম্পূর্ণ মিল ছিল। ম্রিহং-এ স্থাপিত হয়েছিল বুদ্ধের সেই মূর্তিটিই। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় চাঁইঙ্গা ঠাকুর সেদেশের শিল্পি দ্বারা আরাকানের মহামুনি মূর্তির একটি ছবি অংকন (মতান্তরে, অনুরুপ একটি পিতলের নমুনামূর্তি) করে নিয়ে আসেন। স্বগ্রামবাসীর সম্মতি ও সহযোগীতায় আরাকান থেকে কারিগর সংগ্রহ করে সুদক্ষ ভাস্কর দ্বারা এক বছরের মধ্যে ১৮০৫ সালে মতান্তরে ১৮১৩ সালে আরাকানের মহামুনি মূর্তির আদলে সুউচ্চ বৃহদাকারের বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করেন যা একটি বাঁশের বেড়া ও খড়ের চাল বিশিষ্ট ঘরে স্থাপন করা হয়। আরাকানের বুদ্ধমূর্তির আদলে বুদ্ধ মূর্তিটি নির্মাণ করা হয় বলে মহামুনি পাহাড়তলী পরিণত হয় বৌদ্ধ তীর্থ স্থানে। খরের চালা বিশিষ্ট বাঁশের তৈরী যে ঘরটিতে মহামুনি বুদ্ধমূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছিল সেটি হঠাৎ আগুন লেগে ভস্মিভূত হওয়ায় পরবর্তীতে মানরাজাদের বংশধর কক্সবাজার জেলার পালং ধনীপ্রবর কুঞ্জ ধামাই ৩ ফুট পুরু দেওয়াল ২৮ী২৮ ফুট বর্গাকৃতির গম্বুজসহ ৫৮ ফুট উচু একটি কক্ষে ৫ ফুট উচু ও ১৫ী১৫ ফুট বর্গাকৃতির বেদীর উপর ৩২ ফুট উচু বুদ্ধ মূর্তিটি সংস্থাপন করেন। ১৮৪২ খৃষ্টাব্দে কুঞ্জ ধামাইর পুত্র মানরাজা কেইজ চাইং চৌধুরী মূল মন্দিরের চারাকোণে চারটি গম্বুজ সহ চারদিকে বারান্দা এবং একটি তোরণও নির্মাণ করেন।
এ ছাড়াও কুঞ্জ ধামাই মন্দির হতে অনতি দূরে (এক তৃতীয়াংশ মাইল দূরে) পাহাড়ের পাদদেশে একটি ভিক্ষু সীমা প্রতিষ্ঠিত করেন। এ ভিক্ষু সীমাই চট্টগ্রামের প্রথম ভিক্ষু সীমা। এটি হাইঞ্জারঘোনা ঠাকুর (ভিক্ষু)গড়ানী (সীমা) নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ। এই ভিক্ষু সীমা (পাষাণ নিমিত্ত) প্রতিষ্ঠার পূর্বে প্রাচীনকালে উপসম্পদা কর্ম সমাপনের জন্য উদক বা নদী সীমা ব্যবহার করা হতো বলে প্রবীণদের কাছে জানা যায়। বর্তমানে এ বিহার সংলগ্ন স্থানে একটি অনাথ ও বিধবা আশ্রম গড়া হয়েছে।
মহামুনিথমেলাঃ মং সার্কেলের (রাজধানী মানিকছড়ি) রাজা ১৮৪৩ খৃষ্টাব্দে মহামুনি মন্দির চত্বরে মহামুনি মেলার প্রর্বতন করেন, যা বাংলা সনের চৈত্র মাসের শেষ তারিখে শুরু হয়। এ দিনে মহামুনি বুদ্ধকে স্নান করানো হয় এবং নতুন চীবর পরিধান করানো হয়। এ মেলাটি মহামুনি মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। এক সময় মহামুনি মেলা এতই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে অবিভক্ত বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ হতেও এখানে জনসমাগম ঘটেছে। এ মেলাটি তখন ছিলো আদিবাসী এবং বাঙালিদের মিলন মেলা। মহামুনি মেলা চলতো একমাস পর্যন্ত। বর্তমানে এর ব্যাপ্তিকাল কমে এসেছে। মেলা প্রঙ্গণে এ গ্রামের সংগঠন সমুহের উদ্যেগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন মহামুনির সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবৎসর ও চৈত্র মাসের শেষ দিনে পুরাতন বাংলাবর্ষকে বিদায় ও বৈশাখ মাসের ,শুরুতেই বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে মহামুনি মন্দিরে মহামুনি মেলা অনুষ্টিত হবে । তিনদিন ব্যাপী এই মেলায় পাবত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে পাহাড়ী নারী পুরুষ, কিশোর কিশেরীরা, যুবক যুবতীরা আসবেন ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বৌদ্ব সম্প্রদায়ের নানা বয়সী মহিলা পুরুষ আসবে । মহামুিন মন্দির এলাকায় মেলায় পাহাড়ী বাঙ্গলীদের মিলন মেলা পরিণত হবে। মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্টান অনুষ্টিত হবে। মেলায় বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী পাটি হাত পাখা, খেলনার সামগ্রীর দোকান বসে।
মন্দির ও মহামুনি বিগ্রহ স্থাপন উপলক্ষে বৌদ্ধ নর-নারীদেরে আগমনে সুপেয় পানীয় জলের জন্য কেইজ চাইং কুঞ্জ ধামাইর উত্তরাধিকার মংরাজা মহামুনি মন্দিরের কাছাকাছি এক দিঘী খনন করেন যা ‘ধামাইর দিঘী’ নামে পরিচিত। কুঞ্জ ধামাইর উত্তরাধিকার তৎকালীন মংরাজা মহামুনি টিলা ও মহামুনি মন্দির ধর্মীয় বিধান মতে বৌদ্ধ জনসাধারণ ও পার্বত্য জেলার রাজপরিবারের পূর্বসুরীদের হিতার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের ও চট্টগ্রামের সমতল এলাকার নিমন্ত্রিত ভিক্ষুসংঘের সমবেত দান কার্যাদির মাধ্যমে এ মন্দির ও তৎসংলগ্ন চত্বর উৎসর্গ করেন।
কালের ঘাত-প্রতিঘাতে মন্দির সংলগ্ন স্থাপনাসমূহের সৌন্দর্যহানি ও জীর্ণ-শীর্ণ এবং এর অস্থিত্ব বিপন্ন হওয়ায় মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামের সর্বসাধারণের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন ‘মহামুনি মন্দির উন্নয়ন ও সংরক্ষন কমিটি’ সকলের সহায়তায় জানুয়ারী ২০০৮ সালে মহামুনি মন্দিরটি এবং তৎসংলগ্ন চত্বর উন্নয়ন সংস্কার ও আধুনিকায়নের এক মহাপরিকল্পনা বাস্থবায়নের কাজ শুরু করে। এতে মহামুনি গ্রামের সুসন্তান লায়ন রুপম কিশোর বড়ুয়ার অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছে। কমিটির উদ্যেগে ঈ আগ্রহী দাতাদের অর্থায়নে ২০১২ সালে মহামুনি মন্দির চত্বরের পূর্বাংশে নির্মিত অষ্টবিংশ বুদ্ধ মন্দিরের সমাহার মন্দির চত্বরকের আরো বৈচিত্রময় করে তুলেছে। মন্দিরের সম্মুখে অশ্বথ বৃক্ষের পাশে স্থাপিত এশিয়াবাসীদের মধ্যে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বপ্রথম ডি. লিট ডিগ্রীধারী এ গ্রামের সুসন্তান বিশ্বমনীষা ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার আবক্ষমূর্তি মহামুনি মন্দির চত্বরকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। ফলে মন্দির ও মন্দির চত্বর এখন চিত্তাকর্ষক তীর্থস্থান ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে।


